অসমিয়া ভাষা এবং বাংলার সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্যের পারস্পরিক সম্পর্ক ৷৷ একটি কালানুক্রমিক এবং কালিক অনুসন্ধান ৷৷ প্রাককথন

       (মূল গবেষণা অভিসন্দর্ভে ‘উপভাষা’ শব্দটিই ছিল, ‘ভাষাবৈচিত্র্য’ ছিল না)

 


   বাংলা এবং অসমিয়া ভাষা প্রায় পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সময় পর্যন্ত বা মাধব কন্দলির রামায়ণ বা শঙ্করদেবের মহান সৃষ্টিগুলোর আগে অব্দি প্রায় অভিন্ন ভাষা ছিল এই তথ্য আজ প্রায় সর্বজন স্বীকৃত।দুটোই মাগধী অপভ্রংশের থেকে আগত ভাষা।চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাঙের উল্লেখ করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ষষ্ঠ শতকে হিউএন সাঙ  বিহার থেকে শুরু করে পশ্চিম আসাম পর্যন্ত একই ভাষা প্রচলিত দেখেছিলেন,কেবল আসামে সামান্য তফা লক্ষ করেছিলেন।সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন সেই বৈসাদৃশ্য সম্ভবত কেবল ধ্বনিতাত্ত্বিক হবে।অনেক অসমিয়া ভাষাতাত্ত্বিকেরা এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে কামরূপী প্রাকৃতবলে মাগধীর এক আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের কথা বলেন।কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলেন যে বাংলা এবং অসমিয়া সেই কামরূপী প্রাকৃতের থেকেই এসেছেকামরূপী প্রাকৃতের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার করা যাক বা না যাকশ্রীকৃষ্ণকীর্তন লেখা হওয়া পর্যন্ত অসমিয়া এবং বাংলার  ঐতিহাসিক নিকট সম্পর্ককে কেউ অস্বীকার করেন না।কামরূপী প্রাকৃতের ব্যাপারটিও নিরপেক্ষ বিচার করতে অসুবিধে নেই,কেননা,কামরূপ বললে আজকের অসমের মানচিত্র বোঝায় না।বরং ইতিহাসের নানা সময়ে কামরূপ তার মানচিত্র পাল্টেছে।একটা বড় সময় জুড়ে দক্ষিণে সিলেট অব্দি এবং পশ্চিমে বিহারের পূর্ণিয়া অব্দি কামরূপের বিস্তার ছিল। বরং আজকের পূর্ব বা উজান অসম কোনো সময়েই কামরূপের অধীন ছিল না।চর্যাপদের সময় থেকে যদি বাংলা এবং অসমিয়া ভাষার এক হাজার বছরের ইতিহাস ধরি তবে ওই সময় জুড়ে বাংলা এবং অসম দুজায়গাতেই ভাষা নানা বৈচিত্র্য লাভ করেছে এবং দুটো ভাষাতেই অনেকগুলি উপভাষা সৃষ্টি হয়েছে।বাংলাতে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং অসমিয়াতে বাণীকান্ত কাকতিকে দিয়েই প্রণালীবদ্ধ ভাষা অধ্যয়নের সূচনা।তাঁরা মূলত গ্রিয়ার্সনের ভারতের ভাষা সমীক্ষার অর্জনকেই কিছু এদিক ওদিক করেই ভাষা দুটির যে উপভাষা বিভাজনের সূচনা করেছিলেন তার থেকে দুই ভাষার চিন্তাই আজ প্রায় এক শতাব্দী পর বহুদূর এগিয়ে এসেছেস্বয়ং সুকুমার সেন তাঁর ভাষার ইতিবৃত্তেবাংলার সুপরিচিত পাঁচটি উপভাষা রাঢ়ি,বরেন্দ্রি,ঝাড়খণ্ডি,বঙ্গালি এবং কামরূপীর আলোচনা করলেও বলেছেন এগুলো আসলে উপভাষাগুচ্ছতিনি স্পষ্টই লিখেছেন,“তন্ন তন্ন করিয়া কোনো বাঙ্গালা উপভাষার ভৌগলিক জরিপ (Dialect Geography) এখনো প্রস্তুত হয় নাই।অথচ এদিকে আমাদের ভাষা ব্যবহার এবং চিন্তার যতই সমৃদ্ধি বেড়েছে আমরা স্পষ্টই দেখছি সিলেটির মতো এক আঞ্চলিক রূপবৈচিত্র্যকে উত্তর বাংলার ভাষাবৈচিত্র্য তথা কামরূপীর অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা যেমন যায় না,তেমনি তাকে চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে এক বর্গভুক্ত করে বঙ্গালির অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা দুষ্করবাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী মুহাম্মদ আব্দুল হাইকেও দেখা যাবে আলাদা করে ঢাকার উপভাষার আলোচনা করতে। সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার বর্গীকরণের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য  প্রচুর বেড়েছে।হুমায়ুন আজাদ তাই ২০০৯তে তাঁর দুই খণ্ডে প্রকাশিত বাঙলা ভাষা গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণেও উপভাষা অংশের ভূমিকাতে লেখেন,বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে বাঙলা উপভাষারাশি এখনো বর্ণিত হয়নিএমন অবস্থাতে আমরা সিলেটিকে বাংলার এক স্বতন্ত্র ভাষাবৈচিত্র্য তথাউপভাষা ধরে নিয়ে অনুসন্ধানে নামতেই পারি। উপভাষা বদলেভাষাবৈচিত্র্যকেন লিখছি সেই কথাতে আমারা পরে আসছি।

অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি বেণুধর রাজখোয়ার বই Notes on Sylheti Dialect১৯১৩তে প্রকাশিত হবার পর থেকেই বাণীকান্ত কাকতিকে বাদ দিয়ে অধিকাংশ অসমিয়া গবেষক এটা দাবি করে থাকেন যে অসমিয়ার সঙ্গে সিলেটির এতো নিকট সম্পর্ক যে একে বাংলার না বলে অসমিয়ারই একটি উপভাষা হিসেবে দাবি বা বিবেচনা করা যায়।সিলেটিরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দেয়াতে তাদের আক্ষেপ করতেও দেখা যায়।বিলেতে এবং বাংলাদেশে কিছু সিলেটিরা মনে করেন এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা---বাংলাও নয়,অসমিয়াও নয়অন্যদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত জগন্নাথ চক্রবর্তী এবং আবিদ রাজা মজুমদারের দুই অভিধানের কোনোটিতেই বরাক উপত্যকার বাংলাভাষাকে আর যাই হোক ‘সিলেটি’ নামে চিহ্নিত করা হয় নি।প্রথমজন লিখেছেন ‘বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা’,দ্বিতীয়জন ‘বরাক উপত্যকার কথ্য বাংলা’নিরপেক্ষ বিচারে এই সমস্ত  মতেরই পুনর্বিচারের অবকাশ রয়েছে।ভারতের বাঙালি গবেষকেরা এই নিয়ে অধ্যয়ন করবার খুব কম প্রয়াস করেছেন।ঘটনা হচ্ছে যে কেবল অসমিয়াই নয়,ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনার তীর জুড়ে বিশেষ করে দক্ষিণ এবং পূর্ব তীরের প্রায় সমস্ত বাংলার উপভাষা এবং অন্যান্য আর্য ভাষাগুলোর সঙ্গে সিলেটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেগুলোর প্রায় কেউই কোনো তুলনামূলক অধ্যয়ন করেন নি।অসমিয়া তাত্ত্বিকেরা যেমন ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ পরবর্তী অসমের সীমানার বাইরে অধ্যয়ন ক্ষেত্রের বিস্তার ঘটাননি,তেমনি বাংলাতেও যারা অধ্যয়ন করেছেন তাঁরাও প্রতিভাষ্য নির্মাণ করবার বেশি কিছু করেন নি।ঢাকা,নোয়াখালি,চট্টগ্রামের ভাষাবৈচিত্র্যগুলো নিয়ে অসমে বা ভারতে অধ্যয়নও গ্রিয়ার্সন বা সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পর বেশিদূর এগোয় নি।অবশ্য  অধ্যাপক সুধাংশু শেখর তুঙ্গ, অধ্যাপক নিখিলেশ পুরকাইত এবং অধ্যাপক  রবীন্দ্র কুমার দত্তের তিনখানা গ্রন্থ কিছুটা ব্যতিক্রম। সে সম্পর্কে আমরা যথাস্থানে আলোচনা করবএই সমস্ত ভাষাবৈচিত্র্য এবং কাছের প্রতিবেশী কিছু আর্য এবং অনার্য ভাষার নিবিড় অধ্যয়ন এই বিতর্ক দূর করে সম্পর্কের এক সদর্থক পুনর্নির্মাণে সাহায্য করতে পারে বলেই আমাদের ধারণা

         অসমিয়া এবং সিলেটির সম্পর্ক নিয়ে অসমিয়াতে প্রচুর কাজ হয়েছে তথা বইপত্রও মেলে।বাংলাতে অতি অল্প। বইগুলো লেখকেরা তাঁদের মাতৃভাষা ছাড়াও লিখেছেন ইংরেজিতে।এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকা সাময়িকপত্র বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধও আমাদের সাহায্য করেছেএই যেমন পশ্চিমবাংলা থেকে প্রকাশিত ‘কোরক’ কাগজের প্রাক শারদ ১৪১৮ সংখ্যাটাই ছিল পূর্ববঙ্গীয় কথ্যভাষা নিয়ে। সেখানে অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘সিলেটি উপভাষা: প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ নামে একটি লেখা আছে। লেখাটি আকারে ছোট কিন্তু ভারে বড়। সেরকম বেশ কিছু রচনা আমাদের পাথেয় হয়েছেভাষা বিজ্ঞানের পরিচিত প্রধান দুটি পদ্ধতিই আমরা ব্যবহার করেছিঅর্থাৎ i) কালানুক্রমিক,ii) কালিক সেই সঙ্গে অন্যান্য পদ্ধতিও বিশেষ করে সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতিকেও নিশ্চিতভাবেই কাজে লাগাতে হয়েছে।

        শিলচর,করিমগঞ্জের মতো সিলেটি অধ্যুষিত অঞ্চলের কাছাকাছি দুএকটি গ্রাম ছাড়াও পূর্বোত্তর ভারতের সিলেটি প্রধান কিছু এলাকা যেমন ধর্মনগর,শিলং,হোজাই,গুয়াহাটি ইত্যাদি শহরকে বেছে নিয়ে যথাসাধ্য ক্ষেত্র সমীক্ষা আমরা করেছিকিছু সংলাপ আমরা রেকর্ড করেছি।আন্তর্জাল থেকেও ভারত বাংলাদেশের বেশ কিছু গান,নাটক আমাদের সংগ্রহে এসেছে। মেঘালয়ের শিলং এবং বাংলাদেশের শ্রীহট্ট থেকে নির্বাচিত পাঠের অনুবাদ সংগ্রহ করেছি।ধর্মনগর ভ্রমণে আমাদের হাতে এসেছে রামকৃষ্ণ দেবনাথের আশির দশকে লেখা নাটক ‘হকুনর ছাও’এছাড়াও সম্প্রতি প্রকাশিত রণবীর পুরকায়স্থের উপন্যাস ‘সুরমা গাঙর পানি’ আমাদের যথেষ্ট সহায়ক হয়ে উঠেছে

              সিলেটি ভাষা এলাকাতে প্রচলিত অন্যান্য ভাষাবৈচিত্র্য এবং ভাষাকেও প্রয়োজনে অধ্যয়নের আওতাতে নিয়ে এসেছি আমরা কেননা,বাংলার সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্য এবং অসমিয়ার সাদৃশ্য কিছু অবশ্যই রয়েছে,কিন্তু তেমনি বাংলার অন্যান্য ভাষাবৈচিত্র্য এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি,হাজং,চাকমা ইত্যাদি নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর সঙ্গেও সিলেটির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।এই ঘনিষ্ঠতার উপর নির্ভর করে এক সময় কিছু ইউরোপীয় এবং বাঙালি ভাষাবিজ্ঞানীরা অসমিয়া ভাষাকেই বাংলার উপভাষা বলে নির্ণয় করেছিলেন।কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যে সত্য নয় তা আজ আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখেনা।আসলে সামান্য কিছু ধ্বনিতাত্ত্বিক এবং শব্দের মিলের ভিত্তিতে নেওয়া ভাষাবিজ্ঞানের যেকোনো সিদ্ধান্তই বিভ্রান্তিপূর্ণ হতে বাধ্য।ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বর্তমান কালের প্রায়োগিক বাস্তবতাও ভাষা এবং ভাষাবৈচিত্র্যের স্বাতন্ত্র্য তথা ঐক্য নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।এখানে আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে যে ভারতের এই অংশের আর্য ভাষাগুলোর উপর ভোট-বর্মী ভাষাগুলোর প্রভাব নিয়ে এখনো তেমন খুব একটা অধ্যয়ন হয় নি।অসমিয়াতে খানিকটা করেছেন ড উপেন রাভা হাকাচাম।অস্ট্রিকভাষাগুলো নিয়েও আমরা খুবই কম জানি।এরকম এক অধ্যয়নও এই বিতর্কে কিছু সমাধানসূত্র যোগাতে পারে।প্রাথমিকভাবে এই মন্তব্য করা যায় যে অষ্ট্রিক এবং ভোট-বর্মী ভাষাগুলির প্রভাবসূত্রেই বাংলার সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্য এবং অসমিয়া ভাষার মধ্যে নৈকট্য নিবিড় হয়েছে।

         তাই উল্লেখিত বিষয় নিয়ে এক ক্ষেত্রসমীক্ষা ভিত্তিক অনুসন্ধান এই দুই ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমান সামাজিক বিতর্ক এবং উত্তেজনার উপশমেও গভীর সদর্থক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমাদের মনে হয়।আমরাঅসমিয়া ভাষা এবং বাংলার সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্যের পারস্পরিক সম্পর্ক: একটি কালানুক্রমিক এবং কালিক অনুসন্ধা (মূল গবেষণা অভিসন্দর্ভে ‘উপভাষা’ শব্দটিই ছিল, ‘ভাষাবৈচিত্র্য’ ছিল না)শিরোনামে যে গবেষণা কর্ম নিবেদন করছি,সেখানে ভাষা ও উপভাষা বিজ্ঞানের প্রণালীবদ্ধ তাত্ত্বিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে উপরে আভাসিত বিতর্কের মীমাংসাসূত্র সন্ধানের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি

            আমাদের এই গবেষণা কর্মের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপিকা রমা ভট্টাচার্য এবং সহযোগী তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্য শুরু থেকেই আমাদের কাজে নজর রাখছিলেন,এবং তাড়া দিয়ে যাচ্ছিলেন। বহু খুঁটিনাটি প্রশ্নে আমরা ফোনে ই-মেলে দিনেরাতে তাঁদের, বিশেষ করে দেবাশিস ভট্টাচার্যকে বিব্রত করে গেছি। তাঁরা অক্লান্ত দিশা-নির্দেশ করে গেছেন। তাঁদের দু’জনের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং বিনম্র কৃতজ্ঞতা।

            গবেষণা কর্মের এই ক’বছরে নানা সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব আলোচনা চক্রে (seminar) আমাদের উপস্থিত থাকতে হয়েছে,এবং গবেষণা বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করতে হয়েছে সেখানে উপস্থিত বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকেরাও বহু মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন,যেগুলো আমরা মনে রেখেছিলাম এবং তার অনেক কিছুই প্রয়োগে এনে প্রচুর উপকৃত হয়েছি।

            যেখানে আমি কাজ করি,সেই তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ,উপাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে অনেক সহকর্মী শুরু থেকেই প্রচুর উৎসাহ এবং সহযোগিতা করে গেছেন।অনেকে বেশ কিছু বই পত্র-পত্রিকার সন্ধান দিয়েও সাহায্য করেছেন।

            গবেষণার কাজে বিভিন্ন সময়ে যাদের সঙ্গে কথা বলে উপকৃত হয়েছি তাদের মধ্যে শুরুতেই নাম করতে হয় আমাদের দুই শিক্ষক গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য এবং গুরুচরণ কলেজের অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্যের। অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য গোটা একটি দিন সময় ব্যয় করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে গুরুচরণ কলেজের গ্রন্থাগার দেখেছেন এবং বেশ কিছু দুর্লভ বই,পুথির সন্ধান দিয়ে প্রতিলিপি নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।এছাড়াও ভাষা সাহিত্যের দুই সুপরিচিত শিক্ষক এবং গবেষক সঞ্জীব দেব লস্কর এবং তুষার কান্তি নাথকেও আমরা নানা সময়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করে বিব্রত করেছি।তাঁরা নইলে বহু পুরোনো বইয়ের সন্ধানই আমাদের পাওয়া হয়ে উঠত না।এছাড়াও যখনই কোনো সংশয় হয়েছে তাঁদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করে বিব্রত করেছি,তাঁরাও সোৎসাহে সহযোগিতা করে গেছেন। যোরহাট মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ তথা অসমিয়া জাতীয় অভিধান সহ বহু ভাষা এবং সমাজবিজ্ঞানের গ্রন্থ-প্রণেতা ডদেবব্রত শর্মা আমাদের ব্যক্তিগত বন্ধু।তাঁকে পাশে না পেলে অসমিয়া ভাষার বহু রহস্য আমাদের কাছে অধরাই থেকে যেত।এছাড়াও নানা সময়ে আমরা ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে অথবা দূরভাষে কিংবা আন্তর্জালে কথা বলে উপকৃত হয়েছি অধ্যাপিকা অনুরাধা চন্দ,অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়,অধ্যাপক আবিদ রাজা মজুমদার এবং বাংলাদেশের ভাষাবিদ আবু জার এম আক্কাসের মতো অনেকের সঙ্গে।তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমাদের বিনম্র কৃতজ্ঞতা।

            ক্ষেত্র গবেষণা করতে আমরা শুরুতেই গিয়েছিলাম উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগরে।আমাদের বোন জয়ন্তী দেব, ওর বর হিমাদ্রি দেব,বিশেষ করে ওদের বাড়ির পরিচারিকা স্বপ্না নাথের সঙ্গে কথা বলে আমরা উপকৃত হয়েছি।আলাপ করেছি নাট্যকর্মী দীপ্তেন্দু নাগের সঙ্গে।তাঁরা আমাদের সন্ধান দিয়েছিলেন ‘হুকুনের ছাও’ নাটকের।দীপ্তেন্দু নাগ নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সংঘদীপ’ পরিচালিত ধর্মনগরের দেওয়ানপাশাতে অবস্থিত  বৃদ্ধাশ্রম ‘প্রান্তিক’-এ। সেখানকার প্রবীণা আবাসিক খেলা চক্রবর্তী,ভুবনেশ্বরী চক্রবর্তী,চিনু রানী দাস প্রমুখ অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমরা উপকৃত হয়েছি।বদরপুরে আমরা কথা বলেছিলাম নবীন চন্দ্র কলেজের অধ্যাপক বাজলুর রহমান খানের সঙ্গে।তিনি তাঁর বাড়ির পরিচারিকা আলছুমা খাতুনের সঙ্গে আলাপ করবার সুবিধে করিয়ে দিয়েছিলেন।তিনি নিয়ে গেছিলেন শ্রীগৌরীতে কছিমুদ্দীন বলে এক ভদ্রলোকের বাড়ি।যার আদি বাড়ি ছিল পাশের ‘হিলচার’ গ্রামে,যেখানে জন্মেছিলেন সুফি কবি শীতলাংশা। তিনি শীতলাংশার কিছু গান গেয়েও শোনালেন,এবং হাতে লেখা কয়েকটি গানের প্রতিলিপিও ধরিয়ে দিলেন। শিলচরে নাট্যকর্মী বন্ধু নীলকণ্ঠ দাস নিয়ে গিয়েছিলেন  তাঁর আত্মীয় মাছিমপুরের নিজজয় নগরে সুশীল দাসের বাড়িতে। অনুজ কবিবন্ধু রাজেশ শর্মা থাকেন চেংকুড়িতে। তিনি ছাড়াও তাঁর বাড়িতে কথা হলো তাঁর  প্রবীণা মা প্রতিমা শর্মার সঙ্গে। সিলেটের কথাশিল্পী ইকবাল তাজোলি,শিলঙের কবি সুমিতা দাস আমাদের পাঠানো কিছু সিলেটি পাঠ তাঁদের অঞ্চলে প্রচলিত ভাষারূপের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করে দিয়েছিলেন।এছাড়াও ঈশানের পুঞ্জমেঘ ফেসবুক গ্রুপে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেও বহু সংশয়ের নিরসন করেছি,প্রশ্নের জবাব পেয়েছি।তারমধ্যে কয়েকটি নাম নিতেই হয় –তাঁদের মধ্যে মৃন্ময় দেব,রণবীর পুরকায়স্থ,শান্তনু গুপ্ত,মাহবুবুল বারি,মুনিম পারভেজ বড়ভূঞা,মহম্মদ শাজাহান,অশোকানন্দ রায়বর্ধন,উদয় চক্রবর্তী,সুব্রতা মজুমদার, জাকির হোসেন প্রমুখ অনেকেএদের মধ্যে সুব্রতার হাতে পুরো ‘সুরমা গাঙর পানি’ উপন্যাসটি টাইপ করা পেয়ে যাওয়াতে আমাদের নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা অনেকটাই সুবিধে জনক হয়েছিল। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র কৃতজ্ঞতা। 

            শিলচর সানগ্রাফিক্সের কর্ণধার অগ্রজ বন্ধুবর পুণ্যপ্রিয় চৌধুরী যে দ্রুততায় এই সন্দর্ভ ছেপে বাঁধাই করে উপস্থাপনযোগ্য করে তুলছিলেন তার জন্যে তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ।

            এই পুরো সন্দর্ভ আমরা নিজেরাই টাইপ করেছি।এত বিচিত্র সাঙ্কেতিক চিহ্ন ব্যবহার করেছি,যে মনে হল কোনো ছাপাখানা সহজে এগুলো টাইপ করে উঠতে পারত না। ‘আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা’র সম্প্রতি বিকশিত হরফগুলো পেতে অসুবিধে হত।কিন্তু আমাদেরও দুই একটি জায়গাতে অসুবিধে থেকে গেছে। যেমন আলাদা করে যখনই অনুস্বার,বিসর্গ বা স্বরের মাত্রা চিহ্ন ইত্যাদি টাইপ করেছি সেগুলোর ডানে এরকম বিন্দু জুড়ে বৃত্ত থেকে গেছে--‘ং,ঃ’এগুলো দূর করবার প্রায়োগিক ব্যবস্থা এখনো হয়ে উঠেনি।সুতরাং যেখানেই এরকম বৃত্ত দেখা যাবে,সেগুলোকে ‘নিরর্থক’ ভেবে পড়ে যেতে হবে।ভাষা-নামগুলোকে বাংলা –বাং., অসমিয়া—অস., সিলেটি-সিল. এভাবে সংক্ষেপে লিখে গেছি।স্বতন্ত্র করে ‘সাংকেতিক নির্দেশিকা’ দেয়া হয় নি, সেটি বিশাল হবে ভেবে।আশা করছি তাতে পাঠের অর্থ বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হবে না।অসমিয়া পাঠ তথা উদ্ধৃতিগুলো আমরা লিপিবদল ঘটাবার এবং বিভ্রান্তিবশত ত্রুটি এড়াবার জন্যে বাংলা লিপিতেই লিখে গেছি,অর্থাৎ ‘ৰ,ৱ’ –এর জন্যে ‘র,য়’ ব্যবহার করে গেছি। শুধু যেখানেই উদাহরণ হিসেবে অসমিয়া শব্দ বা বাক্যগুলো রয়েছে সেগুলোতে আমরা ‘ৰ,ৱ’-ই ব্যবহার করেছি। সেসব যদি উদ্ধৃতি অংশেও ছিল তবে সেখানেও তাই রেখেছি। ফলে একই উদ্ধৃতিতে অনেক সময় দু’রকম হরফ দেখা যাবে। সেগুলো সচেতন ভাবেই করা হয়েছে।

            সন্দর্ভের যা কিছু কাঠামোগত শৃঙ্খলা এবং ভাষাগত বিশুদ্ধতা তার সবটাই  দুই শ্রদ্ধেয় তত্ত্ববধায়ক শিক্ষকের দান। তারপরেও কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে যাওয়া সম্ভব । সেগুলো আমাদের অনবধানতাবশত হয়ে থাকবে। তার জন্যে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।

            আমাদের গবেষণা যত এগিয়েছে ততই মনে হয়েছে গবেষণার জন্যে বেঁধে দেয়া সময়ের তুলনাতে আমাদের বিষয়ের পরিসর অনেক বিস্তৃত।বহু জায়গা থেকে গেছে যেখানে আমাদের দ্বারা প্রবেশ করা হয়ে উঠে নি।তবু যেটুকু প্রবেশ করেছি তাতে অনেকে নতুন তথ্য এবং সত্যের সন্ধানও পাওয়া গেছে। সেগুলো  যদি পরবর্তী কোনো গবেষককে ভাবায় এবং কাজে আসে তবেই আমাদের কাজটি সার্থক হবে। 

 

~***~

Comments

Popular posts from this blog

।।রোমান হরফে বাংলা লেখার পুরাকথা । ।

।। অসমিয়া-বাংলা- সিলেটি লিপি ।। সপ্তম অধ্যায় ৷৷

।। অসমিয়া,মানবাংলা,সিলেটি এবং দু’একটি প্রতিবেশী ভাষা ও ভাষাবৈচিত্র্যের ধ্বনিতাত্ত্বিক তুলনা ।। তৃতীয় অধ্যায় ৷৷